ছবি

মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার
২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রি.
আটলান্টা, জর্জিয়া


বাসায় যাব, বাংলা মোটর মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, রিকশা সিএনজি কিছুই পাচ্ছি না। হঠাৎ শুনলাম “স্যার পাঁচটা টাকা দেন?”
তাকিয়ে দেখি সাত-আট বছরের একটা মেয়ে, শ্যাম বর্ণ, ময়লা একটা ফ্রক পরা, অযত্নে উসকো-খুসকো চুল, বড় গোলগোল চোখে স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সিএনজি বা রিকশা কিছু না পেয়ে এমনিতেই বিরক্ত হয়ে আছি, আবার এই যন্ত্রণা!
বললাম, “যা ভাগ, টাকা নাই।”
“দেন না স্যার, খালি পাঁচটা টাকা” মেয়েটি বলল।
জিজ্ঞাসা করলাম, “পাঁচ টাকা দিয়া কী করবি?”
“বনরুটি খামু স্যার।”
“তুই খাবি আর তোরে টাকা দিলে, আমি খামু কী” দুষ্টামি করে বললাম?
“স্যার আপনেরা বড়লোক, দেন না স্যার।”
আপদ বিদায় করার জন্য বললাম, “ধর নে” পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিলাম।
মেয়েটি চলে গেল; কিন্তু দুই মিনিটের মধ্যে আবার ফিরে আসল, হাতে একটা বনরুটি।
“কিরে? আবার কী চাস?”
“স্যার বনরুটি আনছি, অর্ধেকটা আপনে খান।”
“কেন?” জিজ্ঞাসা করলাম।
“কইলেন না, আমারে দিলে আপনে কী খাইবেন, আসেন ভাগ কইরা খাই।”
অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকালাম। সে আমার বলা কথা সত্যি মনে করেছে, ভাবছে, সে খেলে আমার না খেয়ে থাকতে হবে। তাই তার খাবারটা আমার সাথে ভাগ করে খেতে চায়। ভাবলাম আহা! আমরা সবাই যদি এই মেয়েটির মত ভাবতে পারতাম, পৃথিবীতে হয়ত না খেয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমত।
হেসে বললাম, “ঠিক আছে তুই খা, আমার লাগবে না।”
“না না স্যার আমার অসুবিধা নাই, আপনে অর্ধেক খান, আমি অর্ধেক।”
এ তো মহা-যন্ত্রণা !
বললাম, “চল দেখি কোন দোকান থেকে বনরুটি কিনছিস।”
দেখলাম একটা টং-দোকান, দোকানদারকে বললাম, “মামা, আমাকেও একটা বনরুটি দাও।”
মেয়েটিকে বললাম, “এবার তুই তোর বনরুটি খা, আমি আমার বনরুটি খাচ্ছি।”
মেয়েটি হেসে খুশি হয়ে খাওয়া শুরু করল।
জিজ্ঞাসা করলাম, “এই তোর নাম কী?”
“স্যার আমার নাম ছবি।”
খাওয়া শেষে হলে ছবিকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আর কিছু খাবি?”
সে মাথা নেড়ে বলল খাবে না, কিন্তু তার চোখ দোকানের লজেন্সের কৌটার দিকে। দোকানদারকে বললাম, “ওরে একটা কাঠি-লজেন্স দাও তো মামা, আর আমারে একটা দুধ-চা দিও।”
কাঠি-লজেন্স হাতে পেয়ে ছবির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে খুব যত্ন করে লজেন্সের মোড়ক খুলল, তারপর পরম তৃপ্তির সাথে খেতে শুরু করল। আমি ছবির খাওয়া দেখছি। অদ্ভুত এক আনন্দ আর প্রসন্নতা শিশুটির সারা মুখে। জনাকীর্ণ শহরের সকল ব্যস্ততা ছাপিয়ে এই দৃশ্যটা আমার চোখে লেগে থাকল। আমি প্রচণ্ড মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকলাম। নিজে ধর্মকর্ম তেমন একটা করি না, কিন্তু এই দৃশ্যটি দেখে কেন জানি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল। দোকানদারকে বললাম, “মামা চা টা একটু পরে দাও, আমি সামনের মসজিদ থেকে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে আসতেছি।”
মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার
২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রি.
আটলান্টা, জর্জিয়া

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top